পুলিশের সহযোগিতায় ৩৫ বছর পর নিজের ভূমি বুঝে পেল বীরাঙ্গনা আফিয়া - Ekushey Media bangla newspaper

Breaking News

Home Top Ad

এইখানেই আপনার বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ: 01915-392400

নিউজের উপরে বিজ্ঞাপন

Saturday, 30 November 2019

পুলিশের সহযোগিতায় ৩৫ বছর পর নিজের ভূমি বুঝে পেল বীরাঙ্গনা আফিয়া


এম এ হাসান, কুমিল্লা:>>>
কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের সহযোগীতায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ওয়ারীশি দলিলমূলে মালিকীয় ভূমির দখল বুঝে পেয়েছে বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুনের পরিবার।
সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথ দিঘী ইউনিয়নের কিং সোনাপুর মৌজায় পিতা-মাতার বসত ভিটা এবং দাদির দলিলসূত্রে প্রাপ্ত ০৬ শতক ভূমির দখল এবং মালিকানার ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেয়ে খুশি জোয়ারে ভাসছেন বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুনের মেয়ে রোকসানা।
রোকসানার ভাষ্য: প্রশাসনের সার্বিক সহযোগীতা না পেলে জমি উদ্ধার একেবারেই অসম্ভব ছিল।জানা যায়,দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছরের দখল, দখলীয় ভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ, ভূমির প্রকৃত মালিকদের খোঁজ-খবর না থাকার সুযোগে উক্ত ভূমির দখল কিংবা মালিকানা ছাড়ার কথা চিন্তায়ও আসে নাই দখলবাজদের। কিন্তু সেই কঠিন কাজকেই দীর্ঘ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাধান করেছেন চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ্ আল মাহফুজ ও এসআই আরিফ হোসেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই সোনাপুর গ্রামের আনা মিয়া, আজিজ মিয়া ও মানু মিয়ার নিকট থেকে বীরঙ্গনা ও তাঁর একমাত্র মেয়ে রোকসানাকে গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে তাদের মালিকানার ৬ শতক ভূমির দখল ও ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দিয়েছে থানা প্রশাসন। বীরঙ্গনার পরিবারকে মালিকানা জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ায় স্থানীয় জগন্নাথ দিঘী সহ চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষ প্রশংসা করছে থানা প্রশাসনের।
পাশ্ববর্তী নোয়াগ্রামের সাংবাদিক ফাহাদ আহমেদ পাটোয়ারী জানান, বীরঙ্গনার পরিবারের দীর্ঘ ২-৩ বছরের কষ্টের ফল পেয়েছে প্রশাসনের মাধ্যমে।বছরের পর বছর দখলে থাকা জমি উদ্ধার হওয়ায় প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাস আরও মজবুত হচ্ছে। এছাড়াও অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে পোষ্ট দিচ্ছেন।
জানা যায়, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বারা নির্মমভাবে সম্ভ্রম হারানো হতভাগ্য এক নারী বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুন খঞ্জনী। তার গ্রামের বাড়ি উপজেলার জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে।সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে আফিয়া খাতুন খঞ্জনী ১৯৩৯ সালে ফেনী জেলার ঐহিত্যবাহী বরৈয়া চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হাসমত আলী চৌধুরী ও মাতা মাসুদা খাতুন।
নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে বিগত ২০১৮ সালের ১৭ই জুলাই বীরঙ্গনা স্বীকৃতি পান আফিয়া খাতুন খঞ্জনী।খঞ্জনী বেগমের শাশুড়ি বোচন বিবির প্রয়াত ছেয়ে রুহুল আমিনের একমাত্র সন্তান রোকসানা। বিগত ৩০-৩৫ বছর পূর্বে বোচন বিবি রুহুল আমিন ও খঞ্জনী দম্পত্তির একমাত্র কন্যা রোকসানার নামে একটি দানপত্র দলিলের মাধ্যমে ৬ শতক ভূমি প্রদান করেন। বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুন যখন ফেনীর পিত্রালয় ও স্বামীর বাড়িতে থাকার সুযোগ পাননি তখন খঞ্জনী বেগমের সাথে একমাত্র কন্যা ছোট্ট রোকসানাও বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েন।তারা আশ্রয় নেন কুমিল্লা শহরের একটি বস্তিতে। একসময় রোকসানার বিয়ে হয় ফুল মিয়া নামের একজনের সাথে। স্বামী-সংসার এবং ছেলেমেয়ে ও মাকে নিয়ে কুমিল্লা বাগিচাগাঁওয়ের ঐ বস্তিতেই কাটতে থাকে তাদের দিন।
এভাবে একটা পর্যায়ে রোকসানা ভুলে যান দাদুর দলিলের বিষয়টি এবং নিজ গ্রাম সোনাপুরের পিতার সম্পত্তির কথা। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক খঞ্জনীর নামে চৌদ্দগ্রামের কনকাপৈত ইউনিয়নের কালকোট মৌজার ৩১ দাগের হালে ৬৪০ দাগে ৫ শতক খাস জায়গা বরাদ্দ দেয়। বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের অধীনে উক্ত ৫ শতক ভূমিতে বীরঙ্গনার পরিবারকে একটি দৃষ্টিনন্দন ঘর করে দিয়েছে সরকার। নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে বিগত ২০১৮ সালের ১৭ই জুলাই রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরঙ্গনা স্বীকৃতি পান আফিয়া খাতুন খঞ্জনী। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি পরিবারটিকে।স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকেই ত্যাগ এবং কষ্ট স্বীকার করে আসা পরিবারটি বীরঙ্গনা স্বীকৃতির মাধ্যমে পেয়েছে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার একটি অবলম্বন।
বিগত ১ বছর পূর্বে দাদির দেওয়া দলিলটি খুঁজে পায় রোকসানা। দলিল অনুযায়ী মালিকানার দাবীতে পিতৃভূমি সোনাপুর যায় সে। কিন্তু দখলদারদের অনেকেই কোনভাবেই দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাজি হয়নি।রোকসানা সামাজিক ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে জানায়।
এক পর্যায়ে রোকসানাকে নিয়ে নিউজ দেখে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ্ আল মাহফুজ বীরঙ্গনার জমি উদ্ধারে এসআই আরিফ হোসেনকে দায়িত্ব প্রদান করেন। এসআই আরিফ হোসেন দায়িত্ব পেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে জমি উদ্ধারে সহযোগীতা প্রদানের অনুরোধ করেন। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি বিচার-শালিসও বসে।
সামাজিক শালিস বিচারে প্রথমে দখলদাররা কোনভাবেই দখলীয় জমি ছাড়তে রাজি হয়নি কিন্তু একটা পর্যায়ে সামাজিক চাপ এবং সত্যের কাছে নতি স্বীকার করে দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দখলদাররা। সামাজিক শালিস বিচারে প্রথমে দখলদাররা কোনভাবেই দখলীয় জমি ছাড়তে রাজি হয়নি কিন্তু একটা পর্যায়ে সামাজিক চাপ এবং সত্যের কাছে নতি স্বীকার করে দখল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দখলদাররা।
সামাজিক বিচার শালিসের মাধ্যমে রোকসানার মালিকানার ৬ শতক জমিনের দখল বুঝে নেয় সে। পরবর্তীতে স্থাপনাসহ চাচা আনা মিয়ার দখলে থাকা ২.২৫ শতক ভূমি মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে কবলা দলিলের মাধ্যমে গত ২৭ নভেম্বর আনা মিয়ার ওয়ারীশগণের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর করেন রোকসানা।পরে ৩০ নভেম্বর বিক্রিত ২.২৫ শতক ভূমির কবলা মূল্যের সমূদয় টাকা রোকসানার হাতে তুলে দেন চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই আরিফ হোসেন।
বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুনের মেয়ে অত্যন্ত আনন্দের সাথে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রশাসন এবং সাংবাদিকদের। তিনি জানান, চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ্ আল মাহফুজ এবং এসআই আরিফ হোসেনের কারণেই জমিনের মালিকানা বুঝে পেয়েছে সে। তাদের সহযোগিতা না পেলে জমিনের দখল কোনভাবেই পাওয়া সম্ভব ছিল না। এসময় তিনি আরও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সাংবাদিকদের নিকট।
সাংবাদিক ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু, তানভীর আহমেদ দিপু, আশিকুর রহমান সোহেল, চৌদ্দগ্রামের বেলাল হোসাইন সহ সহ চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সাংবাদিকদের লেখনীর কারণেই আজকে জমি উদ্ধার, বীরঙ্গনা স্বীকৃতি, সরকারী জমি বরাদ্দ পাওয়া এবং ঘর বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি। চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই আরিফ হোসেন জানান, চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ্ আল মাহফুজের নির্দেশনার আলোকে বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুনের জমি উদ্ধারে ভূমিকা পালন করি।
জমি উদ্ধারে বিগত ৫-৬ মাস থেকে দফায় দফায় বিচার-শালিস, সামাজিক লোকজনের সাথে বারবার যোগাযোগ করতে হয়েছে। মূলত: প্রশাসনের পর্যাপ্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করেই দখলদাররা জমির দখল ছেড়ে দিয়েছে। চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ্ আল মাহফুজ জানান, মুক্তিযোদ্ধা ও বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুন সমগ্র দেশের গর্ব। তাদের কল্যাণেই আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, পেয়েছি একটি স্বাধীন পতাকা।
আফিয়া খাতুনের মালিকানার ভূমি দখলদারদের দখলে থাকার বিষয়টি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পারি। পরবর্তীতে চৌদ্দগ্রাম থানার এসআই আরিফ হোসেনকে বীরঙ্গনার জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করি। বীরঙ্গনা আফিয়া খাতুনের পরিবার নির্দেশনার আলোকেই দীর্ঘদিন ধরে দখলে থাকা জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ায় আমরা আনন্দিত।চৌদ্দগ্রাম থানা প্রশাসন অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় অপরাধ দমনে অত্যন্ত তৎপর।
জমি দখলসহ যে কোন বিষয়ে অভিযোগ পেলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করা হবে।




একুশে মিডিয়া/এমএসএ

No comments:

Post a comment

নিউজের নীচে। বিজ্ঞাপনের জন্য খালী আছে

Pages