স্বাধীনতা যুদ্ধ সব স্বপ্ন কেড়ে নিলেও ‘স্বাধীনতা পেয়ে তৃপ্ত’ জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়া শাহিদা বেওয়া - Ekushey Media bangla newspaper

Breaking News

Home Top Ad

এইখানেই আপনার বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ: 01915-392400

নিউজের উপরে বিজ্ঞাপন

Monday, 16 December 2019

স্বাধীনতা যুদ্ধ সব স্বপ্ন কেড়ে নিলেও ‘স্বাধীনতা পেয়ে তৃপ্ত’ জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়া শাহিদা বেওয়া


একুশে মিডিয়া, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:>>>
শাহিদা বেওয়া ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী দ্বারা তিনি স্বামীহারা  হন। ঐ সময় ছোট-ছোট তিন সন্তানের জননী।  স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ঘরেই ছিলেন এবং তাঁর সামন হতেই স্বামীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো হানাদার বাহিনী। কিছু আলাপ আলোচনা আছে এবং রাতেই তিনি বাড়িতে আসবেন বলেছিল সৈনিকগুলো। স্বামীকে নিয়ে যাওয়াতে আর ঘুম আসেনি শাহিদার।  ভোরবেলা স্বামী গোলজার রহমান মাষ্টারের লাশ গণকবর হতে একটু দুরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঐদিন রাত্রে হানাদার বাহিনী প্রায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলো রামদা ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কচুকাটা করে। মৃত্যুর সময় পানি খেতে চেয়েছিল আর এক আহত ব্যক্তির নিকট সে ও জীবন ভয়ে পালিয়েছে। মাষ্টারকে গুলি করা হয়েছিলো বুক বরাবর। স্বামীর মৃত্যুর খবরে ছুটে গিয়ে স্বামীর নিথরদেহ দেখে নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন সেদিন স্ত্রী শাহিদা বেওয়া। 
গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের করতোয়া নদীর তীরে বালুপাড়া নামে ছোট্র একটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এ গোলজার রহমান মাষ্টার। একটি বেসরকারী স্কুলের শিক্ষক গোলজার রহমান সামাজিক ন্যায়নিষ্ঠায় জীবন পরিচালনাকারী এ মাষ্টার মশাই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবে তার স্কুল বড় হবে এমন চিন্তা চেতনার গল্প করতো স্ত্রী শাহিদার সাথে। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে অভাবের মাঝেও একটি শান্তির নীড় হয়ে ছিলো তার সংসার। স্বামীর স্বপ্ন নিজেও বুনতেন শাহিদা বেগম। 
শাহিদা বেওয়া (৬৭) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও সে সময় গোলজার রহমান শিক্ষিত ও স্কুল শিক্ষক হওয়ায় তার সাথে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয় এ নারীর। গোলজার রহমান মাষ্টারের সহায় সম্পত্তি কিছু রেখে যেতে পারেননি। 
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পর শিক্ষক গোলজার রহমান শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ হওয়ায় এবং এলাকার বুদ্ধিজীবি হিসেবে তাকে হানাদার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য বাড়ী হতে তুলে নিয়ে যায় কিছু আলাপ আছে বলে এবং তিনি একটু পরেই ফিরবেন। কিন্তু তিনি আর ফেরত আসেনি ঐ রাতেই তাকে হত্যা করা হয়। পরদিন তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় জনতা।
স্বামীর মৃত্যুর পর শাহিদা বেওয়া অনেকটা একা হয়ে পড়েন সমাজে। যুদ্ধের মাঝে সন্তানদের নিয়ে লুকিয়ে দিনপার করার পর যখন দেশ স্বাধীন হয় তখন বাড়ীতে ফিরে আসেন শাহিদা বেওয়া। স্বামীর কুঁড়েঘর ও সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে জীবনযুদ্ধে ঝেঁপে পড়েন তিনি। সে সময় থেকে ছেলে মেয়েকে নিয়ে নিদারুন কষ্টে দিনযাপন করেন। এ নারী শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন ক্লাস ফাইভ ও কোরআন শিক্ষা আয়ত্বে থাকায় এ গ্রামের ছেলে মেয়েদের ঐ টুকু শিক্ষার আলোকে কচিকাঁচাদের শিক্ষা দান দেওয়া শুরু করেন।  এভাবে সামান্য কিছু অর্থ আসতো এবং মসজিদ মাদ্রাসা লেপন,ঢেঁকিতে ধান বানা, অন্যের রান্না করে দেওয়াসহ প্রতিদিনের কর্মের উপর তাঁর ও ছেলে- মেয়েদের অন্ন জুটাতো। এলাকার মৃত নারীর গোসল দিয়ে তার পরিধেয় কাপড় পরিধান করতেন তিনি।
দিনের পর দিন এভাবে নিদারুন কষ্টে খেয়ে না খেয়ে পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে এবং ছেলে-মেয়েদের চেষ্টায় ছেলেকে ডাক্তারী পড়ান মেয়েদেরকে ৮ ম ক্লাস পর্যান্ত পড়াশুনা করাতে থাকে সাহিদা বেগম। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়ে রেখেছেন নিজের কাছেই।  শাহিদা বেওয়ার সামান্য শিক্ষা তাকে বুঝিয়েছিলো "শিক্ষার কোন বিকল্প নাই"। অজপাড়াগায়ে একজন নারী অভিভাবক হয়ে ছেলে মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলেছেন এ মমতাময়ী মা।
গোলজার মাষ্টার যুদ্ধকালীন সময়ে মৃত্যু হয়েছে এবং দেশ স্বাধীন হয়েছে, হারিয়েছেন স্বামীকে কিন্তু জীবনযুদ্ধে হারেনি এ নারী। সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আজ সন্তানেরা । যা শাহিদা বেওয়ার চিন্তা চেতনার ফল। দেশ স্বাধীনের পর তার জীবনযুদ্ধের পর্ব শুরু হয়েছিলো এবং তখনই অনেক শান্তি লাগে যখন ছেলে বলে "মা আমিতো তোমার জন্যই বিমানে চড়ে এক দেশ থেকে আর এক দেশে যাই" তখন সবকিছু ভূলে যাই আমি বল্লেন শাহিদা বেওয়া। 
সরকার বিচার বিশ্লেষণ করে ভূমিহীন তালিকার মাঝে শাহিদা বেওয়াকে দু একর জমি বরাদ্দ দেয় । তবে বরাদ্দকৃত জমিটি বেদখল থাকায় এক একর জমি তিনি পায় তা নিয়েই সন্তুষ্ট এ বৃদ্ধা।
ভিটা মাটিহীন এ নারী অনুন্নত অজো পাড়াগায়ে ৪ টি সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলেছেন যাহা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। যার অনন্ত উদাহরণ শাহিদা বেওয়া লক্ষ্য পুরণ করেছেন এবং বলেন,"ছেলেটি আজ এমবিবিএস ডাক্তার হয়েছে, মেয়েরা শিক্ষিত এবং নাতি- নাতনী ইন্জিনিয়ার আমার আর কিছু চাই না"
এ উপজেলার করতোয়া নদীর গাঁ ঘেষে তার ছোট্র একটা বাড়ি বন্যার সময়ে পানি দেখে এলাকার সকলেই দুরে দুরে চলে যায় তখন ভয় লাগলেও বাড়ী ছেড়ে কখনও যায়নি শাহিদা বেওয়া এখানেই তার শেষ ঠিকানা।
নদীর তীরে বড় বড় কয়কটি ফাটল দেখা দিয়েছে এবং এখানে বসতবাড়িগুলো নদী ঘেঁষে অবস্থান হওয়ায় একটি প্রতিবেদন ও বিষয়টি জানার আগ্রহে এ এলাকায় আসা এ প্রতিবেদকের। এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে এই বৃদ্ধার সাথে কথা শুরু হয়। 
শাহিদা বেগম আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন,"ঐ যে ওখানে নদীর মাঝখানে মাষ্টারকে কবর দেওয়া হয়েছিলো, কবরটা শুন্দর ছিলোনা যেনো একটু পাগাড় খোড়া হয়েছিলো। ঐ সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীরা কাশিয়াবাড়ী এলাকায় থাকতো তাই ছুটাছুটির মাঝেই তাকে কবর দেওয়া হয় ঐ কবরের জায়গাটুকুও এ নদীটি রাখেনি "।
স্বাধীনতা যুদ্ধের মাঝে অগনিত যুদ্ধাহত পরিবারের দিকে কতটুকু দৃষ্টি পড়েছে এই স্বাধীন বাংলাদেশে।  এক একটি যুদ্ধাহত পরিবার এক একটি মুক্তিযুদ্ধ এবং এ  কাহিনিগুলোর কতটুকুই বা আমরা তুলে ধরতে পেরেছি ?






একুশে মিডিয়া/এমএসএ

No comments:

Post a comment

নিউজের নীচে। বিজ্ঞাপনের জন্য খালী আছে

Pages