চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টলা ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ২বছর হলো - Ekushey Media bangla newspaper

Breaking News

Home Top Ad

এইখানেই আপনার বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ: 01915-392400

নিউজের উপরে বিজ্ঞাপন

Sunday, 15 December 2019

চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টলা ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ২বছর হলো


মোঃ জিপন উদ্দিন, চট্টগ্রাম:>>>
একাত্তরে গঠন করেন ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। সে সময় গ্রেফতার হন পাকিস্তানি
সেনাদের হাতে। পরে পাগলের অভিনয় করে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান ভারতে। উত্তর প্রদেশের তান্ডুয়া সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্কোয়াডের কমান্ডার নিযুক্ত হন তিনি। পরে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।
তিনি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের টানা তিনবারের মেয়র। রোববার (১৫ ডিসেম্বর) অদম্য চট্টলবীর এই রাজনীতিবিদের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর রাউজানের গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়িতে জন্ম মহিউদ্দিন চৌধুরীর। বাবা হোসেন আহমদ চৌধুরী ছিলেন রেলওয়ে কর্মকর্তা, মা বেদুরা বেগম। ১৯৬২ সালে এসএসসি, ১৯৬৫ সালে এইচএসসি এবং পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে তিনি অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে তিনি নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এরপর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন মহিউদ্দিন চৌধুরী। যুবলীগের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হলে প্রতিশোধ নিতে মৌলভী সৈয়দের নেতৃত্বে ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন করেন। ওই সময় ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামি করা হলে তিনি কলকাতায় চলে যান।
এরপর ১৯৭৮ সালে দেশে ফেরেন।মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বন্দর রক্ষা আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রায় দুই যুগ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার পর ২০০৬ সালের ২৭ জুন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। মেয়র থাকাকালীন তার চশমা হিলের বাসা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বেওয়ারিশ মরদেহ নিজ কাঁধে বহন করে দাফন ও সৎকার করেছেন। অস্থায়ী হাসপাতাল বানিয়ে চিকিৎসকদের মাধ্যমে শত শত ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। কালুরঘাটে গার্মেন্টসে আগুনে পুড়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ও বন্দরটিলায় সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের দাফন-সৎকারে সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
এরশাদ সরকারের শাসনামলের শেষদিকে গ্রেফতার হয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এর প্রতিবাদে অচল হয়ে পড়েছিল পুরো চট্টগ্রাম। ১৯৯৬ সালেও তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। মুহুর্তের মধ্যে প্রতিবাদে চট্টগ্রামের মানুষ নেমে পড়েছিল রাস্তায়।
মহিউদ্দিন চৌধুরী রাজনীতির পাশাপাশি মেয়র হিসেবেও সাফল্য দেখিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তিনি ‘সেবক’ নাম দিয়েছিলেন। যখনই সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ হয়েছে, চট্টলবীর গণমানুষের এই নেতা তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতিবাদ করেছেন।
১৯৯০ সাল থেকে প্রতিবছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেজবানের আয়োজন করেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তার মৃত্যুর পর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বর্তমানে এ আয়োজনে সমন্বয় করছেন বড় ছেলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, শিক্ষা উপমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। প্রতিবছর সেই মেজবানে খাওয়ানো হয় ৪০ হাজার মানুষকে।
মহিউদ্দিন চৌধুরী কখনও চট্টগ্রাম ছেড়ে থাকতে পারেননি। মন্ত্রী ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ার প্রস্তাব তিনি সানন্দে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি চট্টগ্রামবাসীকে নিজের আত্মীয়ের মতো ভালবাসতেন।
২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর হৃদযন্ত্র ও কিডনির জটিলতায় নগরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চট্টলদরদী এই মহান মানুষটিকে হারিয়ে সেদিন চট্টগ্রামবাসী কেঁদেছে, এখনও কাঁদছে তার গুণগ্রাহীরা।
তার স্বরণে নগর আওয়ামী লীগের কর্মসূচিঃ রোববার (১৫ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা, চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগ ব্যাপক কর্মসূচি পালিত করে,কর্মসূচির মধ্যে ছিলো- সকাল ৯টায় চশমা হিলস্থ মরহুমের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত, সকাল ১১টায় কাজীর দেউড়ি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আলোচনা সভা।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি। 
সভায় আমির হোসেব আমু বলেন,মানুষের কল্যাণে সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সেবাধর্মী রাজনীতি করেছিলেন।
এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু আরও বলেন, ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি সকল দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আমার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই সংগ্রামী ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন। মহিউদ্দিন চৌধুরীর রাজনীতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী,
সৃষ্টিধর্মী ও সেবাধর্মী। সিটি মেয়র থাকার সময় এ শহরে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছেন।
জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বলেন, আমি মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ক্ষেপাতাম এই বলে-সুযোগ পেলে তিনি চট্টগ্রামের স্বাধীনতাই চাইতেন। চট্টগ্রামকে এতটাই ভালোবাসতেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৯৮ সালে জাপান গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য তিনি কী কী করেছেন।
চট্টগ্রামের স্বার্থে বন্দর ও এয়ারপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের বিরোধিতা করতেও দ্বিধা করেননি মহিউদ্দিন চৌধুরী। মেয়র থাকাকালীন চট্টগ্রামের কোনো প্রকল্প নিয়ে একনেকে তদবির করতে যাননি। তিনি নিজের উদ্যোগে উন্নয়ন কাজ করতেন।
আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ও মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের মেয়র হয়েছিলেন গণমানুষের নেতা ছিলেন বলে। আমু বলেন,মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকার সময় দোকানের ছোট ছোট সাইনবোর্ডের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষে কোনো ট্যাক্স নিতেন না। গরীব রিকশা চালকের রিকশার লাইসেন্স নবায়নের জন্য কোনো টাকা নিতেন না। এভাবেই তিনি সেবাধর্মী রাজনীতি করেছেন।মহিউদ্দিন চট্টগ্রামকে এতটাই ভালোবাসতেন যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শুধু চট্টগ্রামে থাকার জন্য।
এতে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, তার বক্তব্য বলেন,'মহিউদ্দিন ভাই ছিলেন আপোষহীন রাজনীতিবিদ। তিনি জনগণের জন্য রাজনীতি করতেন। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য রাজনীতি করতেন।
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে হাতেখড়ি হয়েছিলো মহিউদ্দিন ভাইয়ের। পরবর্তীতে শ্রমিক রাজনীতি করার দায়িত্ব পান। শ্রমিক রাজনীতিতে দায়িত্ব পালনকালীন শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। এজন্য তিনি মালিকপক্ষের চক্ষুশুল হয়েছেন। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার আদায় স্বার্থে কখনো আপোষ করেননি। এরপর হাল ধরেন আওয়ামী রাজনীতির। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যখন কেউ প্রতিবাদ করতে পারেনি, ঘর থেকে বের হতে পারেনি তখন মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম থেকে প্রথম প্রতিবাদ করেছেন।
তিনি বলেন, মহিউদ্দিন ভাইয়ের আদর্শকে ধারণ করতে হবে। তার দেখানো পথে চলতে হবে। ন্যায় নীতি সংগ্রামী জীবনের আদর্শ ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। রোববার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে
মহিউদ্দিন চৌধুরীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তাছাড়া মহিউদ্দিন চৌধুরীর সুযোগ্য সন্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল অতিথির বক্তব্যে বলেন,সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর চিন্তা চেতনায় শুধু চট্টগ্রাম।
নওফেল বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে রাজনীতি করেছেন তিনি (মহিউদ্দিন চৌধুরী)। দলের জন্য কাজ করে তিনি জননেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। দলের তৃণমূলের একজন কর্মী থেকে জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় নেতৃত্বে তিনি কখনও আগ্রহ দেখাননি। কারণ তার (বাবা) চিন্তা ও চেতনায় ছিল শুধু চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের উন্নয়ন।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নওফেল বলেন, আমাদের অনেকের মধ্যে নেতৃত্ব গ্রহণের ও অর্জনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবশ্যই থাকবে। সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি আছে বলেই কয়েকদিন আগে একটি চমৎকার পরিবেশে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে। আমাদের পূর্বসূরীরা এমন কিছু করেননি যেখানে দলের সাংগঠনিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় রাখতে সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখতে হবে।
সভায় দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, অ্যাডভোকেট সুনীল সরকার, সহ-সভাপতি ও সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমীন ও এমএ লতিফ, মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন এবং মহিউদ্দিন চোধুরীর স্বরণে বক্তব্য প্রদান করেন।

No comments:

Post a comment

নিউজের নীচে। বিজ্ঞাপনের জন্য খালী আছে

Pages