বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফার ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকী ও কিছু কথা - Ekushey Media bangla newspaper

Breaking News

Home Top Ad

এইখানেই আপনার বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ: 01915-392400

নিউজের উপরে বিজ্ঞাপন

Saturday, 18 April 2020

বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফার ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকী ও কিছু কথা


একুশে মিডিয়া, মুক্তমত রিপোর্ট:
লেখক- এম. আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী
আজ শনিবার ১৮ এপ্রিল বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা এর ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশর মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন মোহাম্মদ মোস্তফা। স্বাধীনতা যুদ্ধের মৃত্যুঞ্জয়ী সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে অন্যতম। বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফারর জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোলার দৌলতখান উপজেলার পশ্চিম হাজীপাড়া গ্রামে। তাঁর বাবা হাবিবুর রহমান ছিলেন একজন হাবিলদার।

মা মালেকা বেগম একজন রত্নগর্ভা ও বীরমাতা। হাবিলদার হাবিবুর রহমানের দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে মোস্তফা ছিলেন সবার বড়। শৈশব থেকেই দুঃসাহসী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। পড়াশোনা বেশিদূর করতে পারেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর উচ্চ বিদ্যালয়ে দু-এক বছর অধ্যয়ন করেন।
ইতিহাসে আমরা অনেকে তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল হিসেবে জানি; প্রকৃত অর্থে তাঁর নাম মোহাম্মদ মোস্তফা। কামাল নামের সংযুক্তি বিতর্কের বিষয়টি অন্য এক সময়ে তুলে ধরব আশা করি। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং স্কুল সনদ অনুযায়ী বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল এর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ মোস্তফা। পারিবারিকভাবেও এ নামে পরিচিত। সেই অনুযায়ী তিনি হলেন বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা।
বাসার সামনে দিয়ে সৈন্যদের সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজ দেখে কিশোর মোস্তফার মনেও সাধ জাগতো সেনা সদস্য হবার। পারিবারিক বাঁধার কারণে ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে যোগ দেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে নিয়োগ দেয়া হয় ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কুমিল্লায়। ভালো বক্সার হিসাবেও রেজিমেন্টে মোহাম্মদ মোস্তফার সুনাম ছিলো। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন পূর্বে বক্সার হিসাবে সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা অবৈতনিক ল্যান্স নায়েক হিসেবে পদোন্নতি পান। এই বীর সেনানি পাকিস্তানি ঘৃণ্য চক্রান্ত বুঝতে পেরে কয়েক জন বাঙ্গালি সৈনিককে সাথে নিয়ে মেজর শাফায়াত জামিল অধিনায়ক লে. কর্নেল খিজির হায়াত খান সহ সকল পাকিস্তানি অফিসার ও সেনাদের গ্রেফতার করেন।

এরপর তাঁরা মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে আশুগঞ্জ, উজানিস্বর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এন্ডারসন খালের পাশ দিয়ে প্রতিরক্ষায় অবস্থান নেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকাল থেকে পাকিস্তানি বাহিনী তীব্র গোলাবর্ষণ শুরু করে প্লাটুন পজিশনের উপরে। সারাদিন যুদ্ধ চলে। ১৮ এপ্রিল সকালে বর্ষণমুখর পরিস্থিতিতে শত্রু দরুইল গ্রামের কাছে পৌঁছে যায়। মূল আক্রমণ আরম্ভ হয় দুপুর ১২ টায় অবস্থানের পশ্চিম দিক থেকে। শত্রুর একটি দল প্রতিরক্ষার পিছন দিক দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে ঘিরে ফেলছিলো। মুক্তিবাহিনী দরুইল গ্রাম থেকে আখাওড়া রেল ষ্টেশনের দিকে পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু নিরাপদে সেখান থেকে সরে আসতে হলে তাদের প্রয়োজন ছিলো নিরবিচ্ছিন্ন কাভারিং ফায়ার। মোহাম্মদ মোস্তফা সহযোদ্ধাদের জানান তিনি নিজে এই কাভারিং ফায়ার প্রদান করবেন এবং সবাইকে পেছনে হটতে নির্দেশ দেন। সহযোদ্ধারা মোহাম্মদ মোস্তফাকেও পশ্চাদপসরণের অনুরোধ করেন। কিন্তু কর্তব্যের টানে অনঢ় মোস্তফা ছিলেন অবিচল। তিনি সহযোদ্ধাদের জানান তাঁর প্রাণের তুলনায় সহযোদ্ধাদের অনেকের প্রাণের মূল্য অধিক। মোস্তফার ক্রমাগত নিখুঁত ফায়ারে পাকিস্তানিদের প্রায় ২০-২৫ জন হতাহত হন এবং তাদের সম্মুখ গতি মন্থর হয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা মরিয়া হয়ে মোস্তফার অবস্থানের উপরে মেশিনগান এবং মর্টারের গোলাবর্ষণ করতে থাকে।
এক পর্যায়ে মোস্তফার এল.এম.জি'র গুলি শেষ হয় এবং তিনি মারত্মক ভাবে জখম হন। তখন পাকিস্তান বাহিনীর সৈনিকরা ট্রেঞ্চে এসে তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে তাঁকে শাহাদাতের স্থানের পাশেই অর্থাৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া উপজেলার দরুইন গ্রামে সমাহিত করা হয়। মোহাম্মদ মোস্তফা তাঁর জীবন দিয়ে সহযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। অসীম সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব 'বীরশ্রেষ্ঠ' প্রদান করেন।
গত বছর এ দিনে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফাকে যে ৮ জন মিলে দাফন করেছেন তাদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি লফিত মিয়া এবং বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফার কবর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যিনি দেখাশুনা করেন সেই ফুলবানু বেগমেরর সাথ কথা হয় তাঁর সমাধিস্থলের পাশে ব্রাহ্মনবাড়িয়ায়। তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদন, আলোচনায় ও তথ্য সংগ্রহে দিনটি অতিবাহিত করি।
একজন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফার সমাধির পাশে স্থানীয় আরো দুই জনের কবর।  স্থানীয়  দুই ব্যাক্তির কবর প্রমাণিত করে বীরশ্রেষ্ঠের সমাধি কতটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বিজয় দিবস ও ১৮ এপ্রিল এলে সমাধিটি পরিস্কার পরিছন্ন করা হয়। তাঁর সমাধি নিজ জেলায় পৃথকভাবে স্থানাতর জরুরী। প্রয়োজনে পৃথক কমপ্লেক্স করে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফার সমাধির পৃথক করতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে যেকয়জন অকুতোবীর জীবন বাজী রেখে দেশের জন্য লড়াই করেছেন, শহিদ হয়েছেন তাঁরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কাছে আমাদের ঋণ আজন্ম । ভোলার সন্তান হিসাবে এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের স্মৃতির উদ্দেশ্য ভোলায় নির্মিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসটার্মিনাল ও বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্মৃতি জাদুঘর। 
মোস্তফার স্ত্রী পিয়ারা বেগম ২০০৬ সালে ও একমাত্র ছেলে মোশারেফ হোসেন বাচ্চু ১৯৯৫ সালে মারা যান। পুত্রবধূ পারভিন আক্তার মুক্তি বেঁচে থাকলেও নাতনি অনামিকা ২০০৪ সালে আগুনে পুড়ে মারা যায়। ১৯৮২ সালে মেঘনা নদীর ভাঙনে দৌলতখানের বাড়িটি বিলীন হয়ে গেলে ভোলা সদরের মৌটুপী গ্রামে চলে আসেন তার পরিবারের সদস্যরা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৫ পদাতিক ডিভিশন সেখানে ৯২ শতাংশ জমিতে ‘শহীদ স্মরণিকা’ নামে একতলা পাকা ভবনটি নির্মাণ করে বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারটিকে পুনর্বাসন করে। 
 বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা বেশ দুর্ভাগা যে, যিনি দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন অথচ তিনিই তাঁর নিজ জেলা তথা তার জন্মস্থানের মাটিতে সমাহিত হতে পারেননি । রত্নগর্ভা ও বীরমাতা মা মালেকা বেগম ক্ষণজন্মা সন্তানের কবর সব সময় দৃষ্টিসীমার মাঝে আগলে রাখতে চান। এটি যেমন বৃদ্ধ মায়ের দাবি তেমনি ভোলা বাসিরও দীর্ঘদিনের চাওয়া বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা নিজ জেলায় সমাহিত হোক।
আজকের এদিনে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা আত্মার মাগফেরাত কামন করি।
লেখক:
এম. আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী
পি.এইচ.ডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: [email protected]


একুশে মিডিয়া/এমএসএ

No comments:

Post a comment

নিউজের নীচে। বিজ্ঞাপনের জন্য খালী আছে

Pages