একুশে মিডিয়া, জয়পুরহাট রিপোর্ট:
আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন জয়পুরহাট-১ জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলা আসন, জাতীয় সংসদের ৩৪ নং এই জয়পুরহাট-১ আসন।
জয়পুরহাট-১ আসনে ভোটার সংখ্যা এখন প্রায় তিন লাখ ৯৮ হ্জার পাঁচশ ৩৬।
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এরইমধ্যে উঠান, গ্রাম, মহল্লা, সামাজিক অনুষ্ঠান সহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও মোটরসাইকেল শোডাউন ও গণসংযোগ করছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।
সূত্র জানা যায়, বিএনপির নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঈদ ও পূজার শুভেচ্ছা দিলেও কোনও পোস্টার বা বিলবোর্ড টাঙাতে এখন পর্যন্ত কোথাও দেখা যায়নি। এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করার জন্য আন্দোলন করা। সেক্ষেত্রে গণসংযোগে এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আর জাতীয়পার্টি গত নির্বাচনে মহাজোটের পক্ষ থেকে এই আসনে মনোনয়ন পেলেও তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে। এবারও মহাজোটের প্রার্থী হওয়ার আশায় মাঠে গণসংযোগ করছেন তাদের একক প্রার্থী। জামায়াতের একক প্রার্থী বিভিন্ন জানাজা, দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠান ও ঈদের শুভেচ্ছার পোস্টারের মাধ্যমে নিজের প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থী বিভিন্ন মসজিদ, পাড়া-মহল্লায় গিয়ে তার মনোনয়নের কথা বলছেন।
দশম জাতীয় সংসদ ও ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন বাদ দিলে জয়পুরহাট-১ আসন বিএনপি প্রার্থীদের দখলেই ছিল। সে কারণে এ আসনটিকে বিএনপির ঘাঁটি বলা চলে। বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচন বয়কট করায় এবং জাতীয় পার্টি প্রার্থী প্রত্যাহার করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামছুল আলম দুদু।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করায় আগামী নির্বাচনে তারা জিতবে। অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, বরাবরই এ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরা আসনটি পুনরুদ্ধার করব।
বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মোজাহার আলী প্রধান মারা যাওয়ার পর দলটির মধ্যে চরম কোন্দল দেখা দিলেও দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে দল গোছাতে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি দুদু ও সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান গ্রুপ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক অনুসারী গ্রুপের মধ্যে কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ তাদের বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচি ও দলীয় কর্মকাণ্ড পাল্টা-পাল্টিভাবে পালন করায় মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর রয়েছে সুযোগ। যদিও জাতীয় পার্টির এ আসনে ভোটের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামছুল আলম দুদু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন ও ক্লিন ইমেজ নিয়ে ভালোভাবেই মাঠে আছেন।
আসছে সংসদ নির্বাচনে জয়পুরহাট-১ আসনে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে এই আসনে প্রায় ৮০ হাজার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে। এই কারণে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল (পিপি) মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
পাঁচবিবি পৌরসভার মেয়র ও পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব বড় বড় বিলবোর্ড, পোস্টার-ব্যানার টানিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় গণসংযোগ করছেন।
এছাড়াও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দোগাঁছী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোমিন আহমেদ চৌধুরী (জিপি), জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ খাজা সামছুল আলম, জয়পুরহাট পৌরসভার মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন ও জেলা যুবলীগের সভাপতি প্রভাষক সুমন কুমার সাহা এ আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সামছুল আলম দুদু জানান, সত্তর দশকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে এসেছি। তারপর থেকে জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে থেকে সুদিন দুর্দিনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। এছাড়া পাঁচবিবি পৌরসভায় এক যুগ ধরে মেয়র থেকে জনগণের সেবা করে এসেছি। এসব উন্নয়ন দেখেই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা ভেঙে গেছে। মনোনয়ন পেলে এবার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটেই আমি জয়ী হব।
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল (পিপি) জানান, জেল-জুলুম সহ্য করে আওয়ামী লীগ করে যাচ্ছি। ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে জেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। তাই দেশনেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিবেন বলে আশা করছি।
জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট. মোমিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমি বিলবোর্ড ও পোস্টার টাঙানো নীতিতে বিশ্বাস করি না। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি জয়ী হব।
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শামসুল আলম বলেন, জয়পুরহাটে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। এক লাখ ৩২ হাজার ভোট পেয়েছিলাম। দল থেকে আবারও মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করব।
পাঁচবিবি পৌরসভার মেয়র ও পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, জননেত্রী শেখ হাসিনার আদর্শকে বুকে ধারণ করে আমি দলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি বিপুল ভোটে জয়লাভ করব। অন্যকে মনোনয়ন দিলে দলের স্বার্থে তার সঙ্গে কাজ করব।
জয়পুরহাট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম বলেন, আমি জয়পুরহাট-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী। দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আমি নিয়মিত গণসংযোগ করছি। আমি আশাবাদী দলীয় মনোনয়ন এবার আমি পাব।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী প্রধান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিই দলের কাণ্ডারী হিসেবে দল পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু তিনি মারা যাবার পর দল বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। বিএনপির দলীয় কার্যক্রমে তা পরিলক্ষিত হয়। সম্প্রতি দলীয় কর্মীদের দৃষ্টিতে সাদামনের মানুষ ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের এখন একমাত্র লক্ষ্য খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে কোনও নির্বাচন নয়। তবুও ফেসবুক ও মোবাইল রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে তারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রভাবশালী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল ও সাবেক মন্ত্রী ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী ট্রাইবুন্যালে আমৃত্যু দণ্ডপ্রাপ্ত (হাইকোর্টে আপিলকৃত) প্রয়াত আব্দুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমের নাম জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।
২০০৭ সালে সংস্কারপন্থি বলে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল ফয়সাল আলীমকে। সে সময় তিনি জয়পুরহাট শহর বিএনপির সভাপতি ছিলেন। কিন্তু বহিষ্কারের পর জেলার কোনও কমিটিতে সদস্য হিসেবেও তার নাম রাখা হয়নি। অবশ্য সেই থেকে তার অনুসারীরা পৃথক কার্যালয় স্থাপন করে শহরে দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন। ফয়সাল আলীম বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রমাণ দিয়েছেন কেন্দ্রে তার অবস্থান বেশ শক্ত। বর্তমানে বিএনপির জেলা কমিটির আংশিক তালিকায়ও তিনি জায়গা করে নিয়েছেন এক নম্বর সদস্য হিসেবে। দল থেকে এবার তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে এমন বিশ্বাস তার পক্ষের নেতাকর্মীদের।
জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান এবার দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে মনোনয়ন চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। জেলা বিএনপির সভাপতি প্রয়াত মোজাহার আলী প্রধানের ছেলে ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা প্রধান ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলজার হোসেন মনোনয়ন চাইবেন।
জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, কারাবন্দি খালেদা জিয়া মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তবে বিএনপি নির্বাচনে গেলে তিনি মনোনয়ন চাইবেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফয়সাল আলীম জানান, আমাদের পরিবারের রয়েছে দীর্ঘ ৬০ বছরের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আমার পিতা একাধিকবার সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদের সদস্য ও পৌরসভার চেয়ারম্যান হওয়ায় এই এলাকার জনগণের সঙ্গে রয়েছে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাই আমি জয়পুরহাট-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী এবং দল থেকে মনোনয়ন পেলে অবশ্যই আমি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হব।
সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান জানান, দল থেকে মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করব না পেলে দল যাকে দিবে তার হয়ে কাজ করব।
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা প্রধান বলেন, দল আমাকে মনোনয়ন দিলে জয়ী হব।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আবার নির্বাচনী মহাজোট হলে জাতীয় পার্টি মহাজোটের ব্যানারে থাকবে। জাতীয় পার্টি যদি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভোটে নামে তবে এবার জাতীয় পার্টি এই আসনটি চাইবে। সেক্ষেত্রে দলটির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আ.স.ম মোক্তাদির তিতাস হবেন জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী। আবার জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন না হলেও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন তিতাসকেই দেয়া হবে কেন্দ্রের এমন ঘোষণার কথাও জানিয়েছেন দলটির জেলা নেতৃবৃন্দ। কেন্দ্রের এমন ঘোষণা পেয়ে গ্রামে গ্রামে গণসংযোগ চলছে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে।
আ.স.ম মোক্তাদির তিতাস বলেন, গত নির্বাচনে আমাকে মহাজোটের প্রার্থী করা হয়েছিল। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি নির্বাচন থেকে সরে গিয়েছিলাম। এবারও জোট হলে আমি প্রার্থী হব। কেন্দ্রের গ্রিন সিগন্যাল নিয়ে আমি মাঠে কাজ করছি।
এদিকে জাসদ, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য দলগুলোর তেমন প্রচার প্রচারণা চোখে না পড়লেও নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে হয়তো প্রার্থী থাকতে পারে।
জয়পুরহাট-১ আসনের বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের কোন্দল না মিটলে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করার পরও এ আসনটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। একুশে মিডিয়া।
No comments:
Post a Comment