মোহাম্মদ ছৈয়দুল আলম:
এক সময় বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই ছিল দেয়াল, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি আর বাজারঘাটজুড়ে পোস্টারের দাপট। রঙিন পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া জনপদ দেখেই বোঝা যেত- নির্বাচন আসন্ন। সেই পরিচিত চিত্র থেকে এবার বড় ধরনের সরে আসছে দেশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনী আচরণবিধিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এনেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো- নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রচারণার ধরন বদলাচ্ছে না, বরং দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি, প্রার্থী-ভোটার সম্পর্ক এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান: শৃঙ্খলা, পরিবেশ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ:
নির্বাচন কমিশনের যুক্তি অনুযায়ী, পোস্টার পরিবেশ দূষণ করে, লেমিনেটিংয়ের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পোস্টার লাগানো নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কথাও সামনে এনেছে ইসি।
ইসির দৃষ্টিতে পোস্টার নিষিদ্ধের মাধ্যমে- নির্বাচনী পরিবেশ আরও শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা কমবে, অর্থবিত্তে শক্তিশালী প্রার্থীদের অতিরিক্ত দাপট রোধ করা যাবে।
এছাড়া যানবাহন শোডাউন, ড্রোন ও অধিক মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, সামাজিক গাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ও ভুয়া তথ্য ঠেকাতে কঠোর বিধান যুক্ত করাও কমিশনের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
তবে এই কঠোরতা মাঠপর্যায়ে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা না গেলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে- এ বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রার্থীদের বাস্তবতা: সুযোগ কমেছে, দায় বেড়েছে;
পোস্টার ছিল প্রার্থীদের জন্য পরিচিতি তৈরির সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম- বিশেষ করে নতুন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের প্রচারণার পরিসর সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একদিকে এই সিদ্ধান্তে- প্রচারণা ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে, সংঘর্ষ ও শোডাউনের ঝুঁকি কমবে, বক্তব্য ও কর্মসূচিভিত্তিক প্রচারণায় গুরুত্ব বাড়তে পারে।
অন্যদিকে- গ্রামীণ ও ইন্টারনেট-অসুবিধাগ্রস্ত এলাকায় প্রার্থীর পরিচিতি সংকট তৈরি হতে পারে,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন,
সামান্য আচরণবিধি লঙ্ঘনেও জরিমানা বা প্রার্থিতা বাতিলের ঝুঁকি বেড়েছে।
ফলে প্রতিযোগিতা যেমন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তেমনি সমান সুযোগ নিশ্চিত করা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ভোটারের দৃষ্টিতে নির্বাচন: পরিচ্ছন্নতা বনাম তথ্যঘাটতি;
ভোটারদের জন্য পোস্টারবিহীন নির্বাচন নিঃসন্দেহে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কম শব্দদূষণ এবং সহিংসতামুক্ত প্রচারণা ভোটারের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে এর উল্টো দিকও রয়েছে।
গ্রামাঞ্চল ও প্রান্তিক ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনও ডিজিটাল মাধ্যমে সক্রিয় নয়। পোস্টার নিষিদ্ধ হলে অনেক ভোটার প্রার্থী সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও গোপন অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন হলেও তথ্যের সমতা নিশ্চিত না হলে ভোটার সিদ্ধান্তহীনতায় পড়তে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নতুন চ্যালেঞ্জ;
এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিস্তারিত বিধি যুক্ত করেছে ইসি। এআই দিয়ে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার- সবকিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল নজরদারি, তথ্য যাচাই ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিতে না পারলে এই বিধান কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
উপসংহার: সংস্কার দরকার, ভারসাম্য আরও বেশি দরকার;
পোস্টারবিহীন নির্বাচন নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এটি পরিবেশ রক্ষা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গণতন্ত্র শুধু নিয়ন্ত্রণে নয়, অংশগ্রহণ ও সমান সুযোগে শক্তিশালী হয়।
প্রচার সীমিত করার পাশাপাশি যদি- সমান সুযোগভিত্তিক টেলিভিশন সংলাপ, প্রার্থী পরিচিতিমূলক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই সংস্কার সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেবে।
অন্যথায় কঠোর আচরণবিধি গণতন্ত্রের শক্তি না হয়ে সীমাবদ্ধতাও হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে- নিয়ম কতটা নয়, বরং নিয়মের ন্যায্য ও সমান প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত করা গেল তার ওপর।
লেখক- সাংবাদিক ও কলাম লেখক




No comments:
Post a Comment