একুশে মিডিয়া, নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঐতিহ্যের আলোকে ভক্তি, ত্যাগ, সাধনা ও অদ্বৈত দর্শনের মহামিলন ঘটাতে বাংলাদেশের একমাত্র ও ঐতিহ্যবাহী ১১ দিনব্যাপী দ্বাবিংশতম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ঋষিধামে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় ঋষিধাম প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই মহা শোভাযাত্রায় দেশ-বিদেশ থেকে আগত হাজারো ভক্তবৃন্দ, সাধু-সন্ন্যাসী, ঋষি, যোগী ও ধর্মীয় প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
দীর্ঘ সাধনা ও প্রস্তুতির পর আয়োজকরা হিন্দু ধর্মের শাশ্বত আদর্শ- সত্য, অহিংসা, ব্রহ্মজ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান নিয়ে এই মহান ধর্মীয় আয়োজনের সূচনা করেন। শোভাযাত্রাটি ঋষিধাম প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে নির্ধারিত সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় ঋষিধামে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রাজুড়ে ছিল ধর্মীয় পতাকা, শঙ্খধ্বনি, কীর্তন, বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাক-ঢোল ও আধ্যাত্মিক সংগীত, যা পুরো এলাকায় ভাবগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
শোভাযাত্রার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বাঁশখালী ঋষিধাম ও চট্টগ্রাম তুলসীধামের মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ পুরী মহারাজ। তাঁর জন্য বিশেষভাবে সাজানো ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়িতে করে তিনি শোভাযাত্রায় অংশ নেন। মোহন্ত মহারাজের ঘোড়ার গাড়িকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ছিল বিশেষ আবেগ ও উৎসাহ, যা পুরো শোভাযাত্রায় এক অনন্য ধর্মীয় ঐতিহ্যের আবহ সৃষ্টি করে।
৬৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা হিন্দু ধর্মীয় মতে আত্মশুদ্ধি, পাপক্ষয় ও মোক্ষলাভের পথ অনুসন্ধানের এক মহাযজ্ঞ। কেবল বাংলাদেশের ভক্তসমাজ নয়, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ভক্তবৃন্দ, সাধু-সন্ন্যাসী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণে এটি আজ আন্তর্জাতিক আধ্যাত্মিক মহামেলায় পরিণত হয়েছে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এই কুম্ভসদৃশ মহামেলায় স্নান, পূজা, নামস্মরণ ও সাধনার মাধ্যমে পুণ্যলাভের আশায় লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ ভক্ত ঋষিধামে সমবেত হন।
মেলা শুরুর আগের দিন শুক্রবার থেকে বৈদিক রীতি অনুযায়ী ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনা, যজ্ঞ, নামসংকীর্তন, ধ্যান-যোগ সাধনা ও সাধুসমাবেশের মধ্য দিয়ে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়। শনিবারের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে দ্বাবিংশতম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দ্বাবিংশতম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ পুরী মহারাজ কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও বিশ্বমানবতার বার্তা দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক যাত্রা সূচনা করেন।
এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজক সূত্র জানায়, এবারের ১১ দিনব্যাপী দ্বাবিংশতম আন্তর্জাতিক ঋষিকুম্ভ ও কুমমেলা হিন্দু ধর্মীয় রীতি ও ভাবগম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রেখে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। ভক্তদের নিরাপত্তা, যাতায়াত, আবাসন ও ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আয়োজকরা আরও জানান, এবারের মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ভক্তবৃন্দ ও ধর্মীয় প্রতিনিধিরা নিয়মিত অংশগ্রহণ করবেন। ফলে ১১ দিনব্যাপী বাঁশখালী ঋষিধাম পরিণত হবে আন্তর্জাতিক তীর্থভূমি ও অদ্বৈত চেতনার এক মহামিলনকেন্দ্রে, যেখানে জাতি, দেশ ও ভাষার ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বমানবতার বাণী উচ্চারিত হবে।




No comments:
Post a Comment