বর্তমান বিশ্ব এক অভূতপূর্ব জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে তীব্র তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস- প্রকৃতির এই পরিবর্তন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মৌসুমি বৃষ্টির ধরনেও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার ঘটনা এখন অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশু-কিশোররাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি অভিভাবকেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং সঠিক সিদ্ধান্তই পারে একটি দুর্ঘটনা এড়াতে। প্রথমত, আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। ভারী বৃষ্টি বা বন্যার সতর্কতা জারি হলে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুদের স্কুলে পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, বাড়ির বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জলাবদ্ধ এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই বৈদ্যুতিক সংযোগ, সুইচ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের কখনোই জমে থাকা পানিতে খেলতে দেওয়া উচিত নয়। তৃতীয়ত, জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখা উচিত। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জলরোধী ব্যাগে সংরক্ষণ করলে জরুরি পরিস্থিতিতে তা কাজে আসবে। চতুর্থত, শিশুদের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে। কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, জরুরি নম্বরে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, বিপদের সময় কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়—এসব বিষয় সহজ ভাষায় তাদের শেখানো প্রয়োজন। আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই হতে হবে শিক্ষার মূল বিষয়। এছাড়া বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূষিত পানি থেকে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে। তাই ফুটানো বা নিরাপদ পানি পান করা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং খাবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা অপরিহার্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক প্রভাবও ফেলে। টানা বৃষ্টি, ঘরবন্দি জীবন বা বন্যার ভয় শিশুদের মনে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখা। প্রয়োজনে গল্প, বই পড়া, আঁকাআঁকি বা শিক্ষামূলক খেলাধুলার মাধ্যমে তাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় আমাদের শুধু দুর্যোগ মোকাবিলা নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও সচেতন হতে হবে। বৃক্ষরোপণ, পানি ও বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার, প্লাস্টিক দূষণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়তে সহায়ক হবে। সন্তান আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে পরিকল্পিত প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আজকের সচেতন অভিভাবকই আগামী দিনের নিরাপদ ও সহনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
লেখক- রেজওয়ানা আইয়ুব, প্রধান শিক্ষক বাউশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়




No comments:
Post a Comment