‘বাঁশখালী মহাপ্লাবন ২০২৬’: ঘূর্ণিঝড় ছাড়াই নজিরবিহীন প্লাবন, পানিবন্দি তিন লক্ষাধিক মানুষ - একুশে মিডিয়া একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদ পরিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

ক্লিক করুন

Breaking News

Home Top Ad

নিউজের উপরে বিজ্ঞাপন

Saturday, 11 July 2026

‘বাঁশখালী মহাপ্লাবন ২০২৬’: ঘূর্ণিঝড় ছাড়াই নজিরবিহীন প্লাবন, পানিবন্দি তিন লক্ষাধিক মানুষ

মোহাম্মদ ছৈয়দুল আলম:

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীতে বড় ধরনের কোনো ঘূর্ণিঝড় ছাড়াই সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বাসিন্দাদের দাবি, তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। টানা কয়েক দিন ধরে পানি না নামায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিকে স্থানীয়রা অনানুষ্ঠানিকভাবেবাঁশখালী মহাপ্লাবন ২০২৬নামে অভিহিত করছেন।

 গেল মঙ্গলবার ( জুলাই) দিবাগত রাত থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অনেক এলাকায় পানি স্থির রয়েছে, আবার কোথাও কোথাও আরও বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, মাছের ঘের স্থানীয় সড়ক তলিয়ে গেছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে পড়েছেন হাজারো পরিবার।

প্রায় ৩৭৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাঁশখালী উপজেলার উত্তরে আনোয়ারা উপজেলা সাঙ্গু নদী, দক্ষিণে কক্সবাজারের চকরিয়া পেকুয়া উপজেলা, পূর্বে সাতকানিয়া লোহাগাড়া উপজেলা এবং পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর। উপজেলার পূর্বাংশ পাহাড়ি, মাঝ দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রধান আঞ্চলিক সড়ক এবং পশ্চিমাংশে জলকদর খাল বিস্তৃত। স্থানীয়দের ধারণা, পাহাড়ি ঢল, টানা বর্ষণ, জোয়ারের প্রভাব এবং পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে।

বাঁশখালী পৌরসভাসহ পুকুরিয়া, সাধনপুর, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, কালীপুর, বৈলছড়ি, কাথারিয়া, সরল, শীলকূপ, গণ্ডামারা, চাম্বল, শেখেরখীল, পুঁইছড়ি ছনুয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের উপজেলায় জনসংখ্যার বড় একটি অংশ সরাসরি বন্যার প্রভাবে রয়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ে জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীর উপকূলীয় অঞ্চল ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে এবারের দুর্যোগের ধরন ভিন্ন। বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকে থাকায় বিস্তীর্ণ জনপদ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, স্মরণকালের মধ্যে এত দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে পানি আটকে থাকার ঘটনা তারা আগে দেখেননি।

বন্যাসংক্রান্ত ঘটনায় পর্যন্ত তিন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন-উপজেলার সরল ইউনিয়নের পশ্চিম জালিয়াঘাটা গ্রামের মোছাম্মৎ তাহিন নুর (১২), বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামের ওমানপ্রবাসী কামাল উদ্দীনের ছেলে মো. আশিক (১১) এবং একই ইউনিয়নের রত্নপুর গ্রামের মোহাম্মদ আনোয়ারের ছেলে মোহাম্মদ মিরাজ ()

ছাড়া শত শত কাঁচা মাটির ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, দোকানপাট, কৃষিজমি মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত পানি জমেছে। পানি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পেলেও ঘরবাড়ি, ফসল জীবিকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

পানিবন্দি হাজারো পরিবার এখন সরকারি বেসরকারি সহায়তার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। অনেক এলাকায় শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ, শিশুখাদ্য প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে রান্নাঘর টিউবওয়েল। ফলে অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েও দুর্ভোগে রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বন্যার পানি কয়দিন ধরে আটকে থাকায় আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষিজমি, মাছের ঘের, গবাদিপশু এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় অনেক পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

দুর্গত মানুষের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানীয় জল, চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, পানি দ্রুত না নামলে মানবিক সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস থানা পুলিশ প্রয়োজনীয় উদ্ধার জরুরি সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠাচ্ছেন।

উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ওমর সানী আকন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি শুকনা খাবার রান্না করা খাবার পৌঁছে দিতে দিন-রাত কাজ করছি। দুর্গত মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, সরকারি বরাদ্দের ত্রাণসামগ্রী পাওয়া মাত্রই দ্রুত বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ, প্লাবিত এলাকা এবং সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment

নিউজের নীচে। বিজ্ঞাপনের জন্য খালী আছে

Pages