উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ঝুঁকিতে, বাঁশখালীতে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি উপকূলবাসীর - একুশে মিডিয়া একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদ পরিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

ক্লিক করুন

Breaking News

Home Top Ad

নিউজের উপরে বিজ্ঞাপন

Saturday, 8 August 2026

উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ঝুঁকিতে, বাঁশখালীতে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি উপকূলবাসীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, একুশে মিডিয়া:

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার উপকূলীয় জনপদে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী, উঁচু টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, উচ্চ জোয়ার নদীভাঙনের কারণে প্রতিবছরই বসতভিটা, কৃষিজমি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বহু পরিবার ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং উপকূলের কয়েকটি ইউনিয়নের গ্রামের পর গ্রাম নদী সাগরগর্ভে বিলীন হলেও গত প্রায় ৩৫ বছরে স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর থেকেই বাহারছড়া, খানখানাবাদ, ছনুয়া, সাধনপুর, পুকুরিয়া, গণ্ডামারা শেখেরখীল ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় নদী সাগরভাঙনে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি বসতভিটা হারিয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ সংস্কার মেরামত করা হলেও স্থায়ী টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ায় দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলেনি।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালী উপকূলে ব্যাপক প্রাণহানি ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, ওই দুর্যোগে উপজেলায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই ঘটনার পর থেকেই উপকূলবাসীর অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে ওঠে একটি স্থায়ী উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণ।

স্থানীয়দের দাবি, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এর বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দেয়। এরপর ছনুয়া, গণ্ডামারা, বাহারছড়া, খানখানাবাদ, সাধনপুর পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বারবার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০১৫ সালে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও কয়েক দফা ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। প্রথমে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা, পরে তা বাড়িয়ে ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ এবং পরবর্তীতে প্রায় ৩১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০২২ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাঁধের বিভিন্ন অংশ নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষ অভিযোগ রয়েছে।

ছনুয়া ইউনিয়নের চেমটখালী এলাকার বাসিন্দা শামশুল আলম হারুনুর রশিদ বলেন, “প্রতিবছর জোয়ারের পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। বাঁধ দুর্বল হওয়ায় লোকালয়ে পানি ঢুকে ঘরবাড়ি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আমরা স্থায়ী উঁচু বেড়িবাঁধ চাই।

গণ্ডামারা ইউনিয়নের খাটখালী আলোকদিয়া এলাকার বাসিন্দা মোক্তার আহমদ এমরান হোসেন বলেন, বাঁধ ভাঙনের কারণে খাটখালী বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ এবং আলোকদিয়া এলাকার বড় অংশ সাগরগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে বহু পরিবার বসতভিটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।

খানখানাবাদ ইউনিয়নের হাছিয়াপাড়া প্রেমাশিয়া এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কার শফর উদ্দীন জানান, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে তারা একাধিকবার বসতভিটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাহাড়ি এলাকায় চলে গেছে। তাদের দাবি, উপকূলকে রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বাঁশখালী উপজেলায় চারটি পোল্ডারের আওতায় ৩৬ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ, ১০৩ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ এবং ২৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সাঙ্গু নদীর তীর রয়েছে। উপজেলায় মোট ৭০টি সুইসগেট বা রেগুলেটরের মধ্যে ৪৬টি সচল, ১৩টি আংশিক সচল এবং ১১টি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

বর্তমানেটেকসই পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’-এর আওতায় খানখানাবাদ ইউনিয়নে দশমিক ৬১০ কিলোমিটার, বাহারছড়ায় কিলোমিটার এবং ছনুয়ায় দশমিক ৮০০ কিলোমিটারসহ মোট দশমিক ৪১০ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন ঢাল সংরক্ষণের কাজ চলছে। এছাড়া সাধনপুর ইউনিয়নে দশমিক ১০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণকাজ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

পাউবো জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় বাঁশখালী উপজেলার জলকদর খাল খননসহ পোল্ডার-৬৪-এর আওতায় একটি পুনর্বাসন প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে ২০ কিলোমিটার জলকদর খাল পুনঃখনন, ছনুয়া গোবিন্দ খালসহ ৭০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার শাখা খাল খনন, ১১টি অকার্যকর সুইসগেট পুনর্নির্মাণ, ১৪টি সুইসগেট প্রতিস্থাপন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচটি ইনলেট-আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পুকুরিয়া, সাধনপুর খানখানাবাদ ইউনিয়নে দশমিক ৮৫০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, গণ্ডামারা, বাহারছড়া ছনুয়ায় দশমিক ৯৭৫ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধের ঢাল সুরক্ষা এবং বাহারছড়া, কাথারিয়া, সরল, চাম্বল গণ্ডামারা ইউনিয়নে ৭৬ দশমিক ০৮৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ সংস্কারের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বর্তমানে বাঁশখালী উপজেলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে এবং কাজের মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদারকি করছেন।

তিনি বলেন, প্রতিবছর আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ঘূর্ণিঝড়, উচ্চ জোয়ার নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয় উপকূলবাসীকে। চলতি বছরের থেকে ১০ জুলাই ভারী বর্ষণ পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কার নয়; উপকূলীয় জনপদকে জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন জলবায়ুজনিত ঝুঁকি থেকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনায় একটি স্থায়ী, উঁচু টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণই এখন সময়ের দাবি। বিষয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

No comments:

Post a Comment

নিউজের নীচে। বিজ্ঞাপনের জন্য খালী আছে

Pages