রুশমী আক্তার, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি :
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লোহাগাড়া উপজেলা একসময় ছিল লোকজ সংস্কৃতি, গ্রামীণ মেলা ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবে মুখর জনপদ। পল্লীর মানুষ তখন দুঃখ-দুর্দশাকে ভুলে মিলনমেলায় গড়ে তুলত সাংস্কৃতিক বন্ধন। সময়ের স্রোতে আজ সেই রঙিন আয়োজনগুলো বিলুপ্তির পথে; কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে কেবল আমিরাবাদ ইউনিয়নের শতবর্ষ প্রাচীন ‘বড় মাওলানার ঘোড়দৌড় মেলা’।
লোকজ সংস্কৃতি মানে মানুষের আত্মিক বিকাশ, নান্দনিক চেতনা ও সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ। সেই সময়ের মানুষ ছিলেন সহজ-সরল প্রকৃতির, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও উদার মনের। তাঁরা গ্রামীণ মেলা, গানের আসর ও নাট্যচর্চার মাধ্যমে সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় রাখতেন।
একসময় লোহাগাড়ার জনপদে জারি, সারি, মারফতী, ভাটিয়ালী, রাখালী, কবিগান, পুঁথিপাঠ ও পালাগান ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণ। বিয়েতে পালকি, তানজান, বৈশাখ ও পৌষের মেলায় গরুর লড়াই, বলিখেলা, জাদু ও তুম্বু খেলা- এসবই ছিল লোকজ উৎসবের অংশ।
প্রবীণ শিক্ষক মোবারক আলী, আহমদ কবির ও মো. শফি জানান, “সেই সময়ের মানুষ ছিলেন নির্মল, সরল ও উদার। তাঁদের আনন্দ ছিল নিজেদের সংস্কৃতিতে, নিজের মাটির গন্ধে। এখন অপসংস্কৃতি ঢুকে গেছে, তাই সেই সৌন্দর্য আর নেই।”
একসময় সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ সাতকানিয়া গোলামবারী উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়মিত সামাজিক ও ঐতিহাসিক নাটক মঞ্চস্থ হতো। সাহিত্যরসিক বাবু নির্মল চন্দ্র পালের পরিচালনায় এসব নাটকে অংশ নিতেন এলাকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। অভিনেতা নুরুন্নবী চৌধুরী, মমতাজুল ইসলাম, মাস্টার অলি উল্লাহ চৌধুরী, রেজাউল কবির ও কৌতুক অভিনেতা মাহমুদুল হকের অভিনয়ে দর্শকরা বিমোহিত হতেন।
কালের বিবর্তনে সেই মেলা, গান, নাটক ও গ্রামীণ মিলনমেলা আজ অতীত। স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, “আজকের প্রজন্ম জানেই না তানজানের গান বা ভাটিয়ালীর সুর কেমন ছিল। অপসংস্কৃতির ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই স্বাদ, সেই রূপ।”
তবুও আশার কথা, আমিরাবাদ ইউনিয়নের শতবর্ষ প্রাচীন ‘বড় মাওলানার ঘোড়দৌড় মেলা’ আজও টিকে আছে ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে।




No comments:
Post a Comment